পর্ব ২: মুক্তির পথ ও ভয়ংকর গুহার অভিশাপ
সব শুনে সোহাগের চোখেমুখে অদম্য জেদ ফুটে উঠল। সে চারপাশের নিথর ছায়াগুলোর দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "এভাবে হার মানলে চলবে না। আমাদের যেভাবেই হোক এখান থেকে মুক্ত হতে হবে। ওই অশুভ কালো ছায়াকে ধ্বংস করে শুধু নিজেদের নয়, পুরো পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে। আপনারা সবাই কি আমার সাথে আছেন?"
মুহূর্তের নীরবতা ভেঙে সমস্বরে সবাই বলে উঠল, "হ্যাঁ সোহাগ, আমরা তোমার সাথে আছি!"
তখন ভিড়ের মধ্য থেকে একটি কালো ছায়া এগিয়ে এসে সতর্ক করে দিল, "সোহাগ, মনে রাখিস, ওর সাথে লড়তে হলে তোর নিজের শক্তি যাতে সে শুষে নিতে না পারে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। নিজেকে ওর অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে।"
সোহাগ চিন্তিত স্বরে জানতে চাইল, "সেটা কীভাবে সম্ভব? আমি কী করব?"
অন্য একটি ছায়া তখন আশার আলো দেখিয়ে বলল, "সোহাগ, যদি এই অন্তহীন যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে চাস, তবে তোকে পবিত্র কোরআন শরীফের একটি কপি খুঁজে বের করে আনতে হবে। ওটাই পারে একমাত্র আমাদের রক্ষা করতে।"
সোহাগ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কিন্তু আমি এই অচেনা জায়গায় কোরআন শরীফ কোথায় পাব?"
ছায়াটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল, "সেটি আছে এখান থেকে অনেক দূরে, এক গহীন গুহার ভেতরে। গুহার ঠিক কোন জায়গায় তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু সাবধান! সেখানে যাওয়া মানেই হলো সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দেওয়া। কারণ, সেই গুহায় বাস করে এক ভয়ংকর দানব।"
ভয়ংকর সেই দানবের বর্ণনা দিতে গিয়ে ছায়াটির কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। সে বলল, "ওই গুহাতে কেউ প্রবেশ করলেই দানবটি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে তার ধারালো নখ বা চাকু দিয়ে শরীরের চামড়া এমনভাবে চিরে ফেলে যে, মনে হয় কেউ বুঝি পাকা আম বা পেঁপে পলেপলে করে কাটছে। শুধু তা-ই নয়, গুহার মাটিতে ছড়ানো থাকে লবণের সাথে শুকনো মরিচের গুঁড়ো। চামড়া ছিলে যাওয়ার পর দানবটি সেই ব্যক্তিকে ওই লবণের মাটিতে হামাগুড়ি দেওয়ায়, গড়াগড়ি দেওয়ায়। সেই অসহ্য যন্ত্রণায় যখন মানুষটি আর্তনাদ করতে থাকে, তখন দানবটি তাকে সরাসরি ওই প্রধান কালো ছায়ার হাতে তুলে দেয়। আর সেই কালো ছায়া মুহূর্তের মধ্যে তার সমস্ত শক্তি, সমস্ত অস্তিত্ব শুষে নেয়।"
ছায়াটি সোহাগের দিকে তাকিয়ে করুণ মিনতি করল, "তাই বলছি সোহাগ, ও পথে যাস না। ওটা একটা মরণফাঁদ।"
অন্যান্য ছায়ারাও তখন সমস্বরে বাধা দিল, "না সোহাগ, ওখানে যাওয়া মানে মৃত্যুকে ডেকে আনা। আমরা তোমাকে হারাতে পারব না।"
কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে গেল যখন কালো ছায়ার সর্দার গম্ভীর স্বরে কথা বলে উঠল। সে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল, "তোমরা সবাই নিজেদের কথা ভাবছ, কিন্তু সোহাগের কথা একবারও ভাবছ না? আমরা হয়তো এই অভিশপ্ত জগতে চিরকালের জন্য বন্দি হয়ে গেছি, কিন্তু সোহাগ তো নয়। ওর শরীর এখনো তাজা, ওর মধ্যে জীবনের শক্তি আছে যা হাজার বছর ধরে আমাদের শরীর থেকে শুষে নেওয়া হয়েছে। ও-ই আমাদের একমাত্র আশার আলো। যদি এখান থেকে কেউ বেরিয়ে যেতে পারে, তবে সে একমাত্র সোহাগই।"
সর্দারের এই যুক্তিপূর্ণ কথায় সবাই থমকে গেল। তারা বুঝতে পারল, সোহাগকে গুহায় পাঠানো ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই। নিজেদের স্বার্থেই সোহাগকে এই ঝুঁকি নিতে হবে। তখন সব কালো ছায়া একজোট হয়ে সিদ্ধান্ত নিল, তারা নিজেরাই সোহাগকে ওই গুহার প্রবেশপথ পর্যন্ত নিয়ে যাবে।
সোহাগের বুকের ভেতর ধুকপুকানি থাকলেও সে প্রস্তুত। সে পবিত্র কোরআন উদ্ধারের জন্য এবং সবাইকে মুক্তি দেওয়ার জন্য গুহার দিকে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিল।
