বান্দরবানের রুমায় মারমা কিশোরীকে তিন দফায় ধর্ষণ: গ্রেপ্তার ৪ | অপরাধ সংবাদ

বান্দরবানের রুমায় ১৫ বছরের এক মারমা কিশোরীকে তিন দফায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। গর্ভপাতের ওষুধ খাওয়ানোর অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

রুমা থানা, বান্দরবান পার্বত্য জেলা—পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাতজনের কালো সিলুয়েট

 

পাহাড়ে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো একটি লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে চলেছে বান্দরবানের রুমা উপজেলায়। জেলার রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের দুর্গম তংমক পাড়া এলাকায় ১৫ বছর বয়সী এক মারমা কিশোরীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে পৃথক সময়ে তিন দফায় সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই জঘন্য ঘটনার পর ওই কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে আসামিরা গর্ভপাতের ওষুধ খাইয়ে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে বলে জানা গেছে। পুলিশ ইতোমধ্যে এ ঘটনায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

​ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

​স্থানীয় পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের এপ্রিল মাসের একটি সন্ধ্যার ঘটনা। ওই কিশোরীর বাবা-মা তাদের দৈনন্দিন কাজের অংশ হিসেবে জুমঘরে অবস্থান করছিলেন। সেই সুযোগে কিশোরী বাড়িতে একা থাকার সময় তংমক পাড়ার বাসিন্দা ক্য হ্লা চিং মার্মার ছেলে ক্য সিং নু মার্মা বাড়িতে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে তাকে জোরপূর্বক বাড়ির পাশের জঙ্গলে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে সে। এ সময় অসহায় কিশোরী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে দেশীয় অস্ত্রের মুখে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়, যাতে সে মুখ খুলতে না পারে।

​অপরাধের পুনরাবৃত্তি ও গর্ভাবস্থা

​প্রাথমিক এই ঘটনার পর অভিযুক্ত ক্য সিং নু মার্মার বন্ধু উহাইমং ও সিংহ্লা বিষয়টি জানতে পারে। কিন্তু অপরাধের প্রতিবাদ করার বদলে তাদেরই আরেক পরিচিত বিবাহিত যুবক উশৈনু মার্মাসহ অন্যরা এই সুযোগটি নেয়। প্রথম ঘটনার প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন পর উশৈনু মার্মাও ওই কিশোরীকে বাড়িতে একা পেয়ে একইভাবে ধর্ষণ করে। এভাবে পরপর তিন দফায় পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে একপর্যায়ে কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে।

​দীর্ঘদিন বিষয়টি চেপে রাখলেও প্রায় তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যখন তার শারীরিক নানা জটিলতা ও অসুস্থতা দেখা দেয়, তখন সে স্থানীয় এক ধাত্রীর শরণাপন্ন হয়। ধাত্রীর মাধ্যমে গর্ভধারণের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর কিশোরী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং ভয়ে ভয়ে তার মাকে পুরো ঘটনা খুলে বলে। পাড়াবাসী ও স্থানীয়দের মাঝে ঘটনাটি জানাজানি হলে প্রভাবশালী অভিযুক্তদের মধ্যে একজন—সিংহ্লা মার্মা তড়িঘড়ি করে স্থানীয় বাজার থেকে গর্ভপাতের ওষুধ বা পিল কিনে এনে জোরপূর্বক কিশোরীকে সেবনে বাধ্য করে।

​পুলিশের পদক্ষেপ ও বর্তমান পরিস্থিতি

​ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে রুমা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মানস বড়ুয়া গণমাধ্যমকে জানান, রুমা উপজেলায় এক কিশোরীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে ইতিমধ্যে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত চারজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। মূল অপরাধীদের বাকি সহযোগীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

​মতামত ও বিশ্লেষণ

​ইতিবাচক দিক:

এই ঘটনার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের তাৎক্ষণিক এবং কঠোর পদক্ষেপ। অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ কোনো সময় ক্ষেপণ না করে অভিযান চালিয়ে চার অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে, যা পাহাড়ি অঞ্চলে অপরাধ দমনে একটি জোরালো বার্তা দেয়। এছাড়া সমাজ বা পরিবারে ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে কিশোরীর পরিবার আইনি লড়াইয়ের পথে এগিয়ে এসেছে, যা অপরাধীদের শাস্তির মুখোমুখি করতে অত্যন্ত জরুরি।

​নেতিবাচক দিক:

এই লোমহর্ষক ঘটনাটির সবচেয়ে অন্ধকার দিক হলো অপরাধের পর তা ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ভিকটিমের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি। বিশেষ করে, গর্ভপাতের ওষুধ জোরপূর্বক খাইয়ে আলামত নষ্ট করার যে অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, তা কেবল অমানবিকই নয়, বরং আইনের চোখে চরম অপরাধ। এ ধরনের ঘটনা পাহাড়ি জনপদে নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষার চরম দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তোলে।

Post a Comment

NextGen Digital Welcome to WhatsApp chat
Howdy! How can we help you today?
Type here...