দেশের গণপরিবহনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের হাওয়া: আসছে ১৪০০ বৈদ্যুতিক বাস ও মনোরেল

 

দেশের গণপরিবহনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের হাওয়া: আসছে ১৪০০ বৈদ্যুতিক বাস ও মনোরেল


​ইভি বাসের মূল চালিকাশক্তি হলো এর চার্জিং অবকাঠামো। এটি যেন কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে না থাকে, সেজন্য একটি সার্বজনীন বা ইউনিভার্সাল চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে।

​বিআরটিসির বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (BRTC) দেশের ৬৪টি জেলায় তাদের নিজস্ব জমিতে হাই-টেক চার্জিং স্টেশন স্থাপন করবে। এগুলো শুধু সরকারি বাসের জন্য নয়, বরং বেসরকারি অপারেটর ও সাধারণ মানুষের ইভি গাড়ির জন্যও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উন্মুক্ত থাকবে।

​জাতীয় স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET) এবং মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (MIST)-এর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি ব্যাটারির লাইফ, চার্জিং পোর্ট এবং যান্ত্রিক সামঞ্জস্যের জন্য একটি জাতীয় মানদণ্ড বা স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করছে। ভবিষ্যতে এই স্ট্যান্ডার্ডের ওপর ভিত্তি করেই দেশে বৈদ্যুতিক মিনিবাস ও ট্রাকও নামানো হবে।


মেট্রোরেলের বিকল্পে মনোরেল ও বিআরটি সংস্কার

যেসব ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বা রুটে বিপুল ব্যয়ের মেট্রোরেল নির্মাণ করা ভৌগোলিক বা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব নয়, সেখানে মনোরেল চালুর কথা ভাবছে সরকার। এই মনোরেলের রুট ম্যাপ ও কারিগরি দিক মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বুয়েটকে। এর পাশাপাশি ঢাকা ও আশপাশের বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (BRT) ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক এবং ট্রাফিক ফ্রেন্ডলি করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ যেখানে: বেসরকারি বিনিয়োগ ও ভাড়া বিতর্ক


সচিব ড. জিয়াউল হক স্বীকার করেছেন যে, বাংলাদেশ এখনও বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। তাই বেসরকারি বাস মালিকদের এই খাতে আকৃষ্ট করতে ট্যাক্স হলিডে বা কর ছাড়সহ বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
​তাছাড়া, বেসরকারি খাতের বড় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করার আগে বিআরটিসির প্রাথমিক ইভি বাসগুলোর পারফরম্যান্স ও স্থায়িত্ব পর্যবেক্ষণ করতে চান। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বৈদ্যুতিক বাসের চড়া আমদানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচের বিপরীতে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়া নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যে ভাড়া নিয়ন্ত্রণে রাখতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে বিশেষ ভর্তুকির বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে সড়ক পরিবহন বিভাগ।


​এই উদ্যোগ নিয়ে একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন (পজিটিভ ও নেগেটিভ মন্তব্য)


​🟢 ইতিবাচক মন্তব্য (Positive Aspect)


সরকারের এই গ্রিন ট্রান্সপোর্টেশন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এটি একদিকে যেমন শহরের বায়ুদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমাবে, অন্যদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশের গণপরিবহনে তার ধাক্কা লাগবে না। বুয়েট ও এমআইএসটির মতো শীর্ষ সংস্থাকে যুক্ত করায় প্রযুক্তির মান নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য পৃথক ১০০টি বাসের ব্যবস্থা এবং ৬৪ জেলায় সর্বজনীন চার্জিং স্টেশন স্থাপন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

​🔴 নেতিবাচক/চ্যালেঞ্জিং মন্তব্য (Negative/Critical Aspect)


কাগজে-কলমে এই মেগা প্রজেক্ট অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হলেও, এর মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের মধ্যে ১৪০০ বাসের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কতটা সম্ভব, তা ভাবনার বিষয়। এছাড়া ব্যাটারি চালিত থ্রি-হুইলারগুলো যেখানে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করছে, সেখানে বিআরটিসি স্টেশনগুলোর বাণিজ্যিক সঠিক তদারকি না হলে বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা বাড়তে পারে। পাশাপাশি, ভর্তুকি দিয়ে কতদিন ভাড়া নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে এবং দেশের ভাঙাচোরা সড়কে এই সংবেদনশীল ইভি বাসগুলো কতদিন টিকবে, সেই টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জগুলো এখনো ধোঁয়াশাপূর্ণ।