শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ভারতের ‘সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক ভূমিকা’ প্রয়োজন: শামা ওবায়েদ


শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ভারতের ‘সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক ভূমিকা’ প্রয়োজন: শামা ওবায়েদ


 জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত দণ্ডপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। আর এই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সফল করতে প্রতিবেশী দেশ ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সদিচ্ছার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

​বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এ কথা জানান।


দিল্লির সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ


পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত বিভিন্ন মামলার আসামিদের আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ঢাকা একাধিকবার নয়াদিল্লির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করেছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠি ও অনুরোধের বিষয়ে ভারত সরকার ইতিবাচক সাড়া দেবে এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছে বর্তমান প্রশাসন।
​শামা ওবায়েদ বলেন:
​"বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, বহুমুখী এবং ঐতিহাসিক। শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার চলমান এই ইস্যুটি দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক ফোরামে (যেমন বিমসটেক) দুই দেশের মধ্যকার স্বাভাবিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা যথারীতি অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।"

জুলাইয়ের শহীদদের জন্য ‘ক্লোজার’ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং আত্মত্যাগের বিষয়টি আবেগ ও দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের জনগণ, গণতান্ত্রিক ধারা এবং বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতার স্বার্থেই জুলাইয়ের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা অপরিহার্য।
​তিনি বলেন, "এই জুলাই মাসে দাঁড়িয়ে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, যারা রক্ত দিয়েছেন, যারা প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা এখনও পঙ্গুত্ব বরণ করে চিকিৎসাধীন আছেন—তাদের পরিবারের জন্য একটি 'ক্লোজার' বা সান্ত্বনা প্রয়োজন। স্বজনহারা পরিবারগুলো দেখতে চায়, তাদের সন্তানদের হত্যাকারীদের দেশের মাটিতে সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে।


আইনের চোখে পলাতক আসামি: আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই


শেখ হাসিনার আইনি অবস্থান স্পষ্ট করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের আইন অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত কোনো আসামির আর নতুন করে আত্মসমর্পণের সুযোগ থাকে না। ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে পা রাখামাত্রই তাঁকে আইনগতভাবে গ্রেপ্তার করা হবে। স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার আইনি দিকগুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছে।
​বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) অনুযায়ী এই আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সব নিয়ম মেনেই আসামিদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

ট্রাভেল ডকুমেন্ট ও ভারতের ভূমিকা


শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে তাঁকে ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা ভ্রমণ নথিপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়াটি কেমন হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ জানান, পাসপোর্ট বা ভিসাসংক্রান্ত বিষয়গুলো মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। তবে এ ক্ষেত্রে ভারত সরকারেরও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।
​দুই দেশের বিদ্যমান এক্সট্রাডিশন ট্রিটি অনুযায়ী যদি ভারত সরকার এই প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে চায়, তবে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে দ্রুত কাগজপত্রের সমাধান সম্ভব। এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রত্যর্পণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিতকরণে ছবিসহ একটি 'ট্রাভেল ডকুমেন্ট'-এর প্রয়োজন হয়। এই বিশেষ ডকুমেন্টটি ভারত সরকার যেমন ইস্যু করতে পারে, তেমনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

বিশ্লেষণ ও প্রেক্ষাপট (গুগল র‍্যাংকিংয়ের জন্য অতিরিক্ত যুক্ত তথ্য)


উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শতাধিক হত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। এমতাবস্থায়, দুই দেশের বিদ্যমান ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাঁকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতির সবচেয়ে বড় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে।