মধ্যপ্রাচ্যে আবারও নতুন করে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অর্জিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’ ভেঙে পড়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভয়াবহ সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। দুই দিনে ইরানে মার্কিন বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার বিপরীতে পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যকে এক চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
দুই দিনে ১৭০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী, গত মঙ্গল ও বুধবার ইরানজুড়ে প্রায় ১৭০টির বেশি সামরিক স্থাপনায় তাণ্ডব চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। প্রথম দফায় মঙ্গলবার রাতে ৮০টি এবং দ্বিতীয় দফায় বুধবার রাতে ৯০টিরও বেশি পয়েন্টে আঘাত হানে তারা।
এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন লঞ্চপ্যাড, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো।
ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক সংকট
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, গত ৮ ও ৯ জুলাই পাঁচটি প্রদেশে চালানো মার্কিন আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত ১৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন ৭৮ জন, যাদের মধ্যে ৪৭ জন বর্তমানে হাসপাতালের বিছানায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। ইরানশাহরের গভর্নর জানিয়েছেন, সেখানে একটি বিমানবন্দরের ভবনে আঘাতের ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, আক্কালার রেলসেতু এবং চাবাহারের মেরিটাইম ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনাও রেহাই পায়নি মার্কিন এই আক্রমণ থেকে।
তেহরানের কঠোর জবাব
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) চুপ করে বসে থাকেনি। তারা বুধবার মধ্যরাতে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসির দাবি, কুয়েতের আরিফান ও আল-সালেম এবং বাহরাইনের জাফাইর ও শেখ ইসা ঘাঁটিতে পরিচালিত এই যৌথ অপারেশন ছিল মার্কিন আগ্রাসনের সরাসরি জবাব। আইআরজিসির হুঙ্কার, ‘যদি শত্রুপক্ষ তাদের উসকানিমূলক তৎপরতা অব্যাহত রাখে, তবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন অন্যান্য ঘাঁটিগুলোও আমাদের কঠোর অভিযানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।’
ভেস্তে গেল ইসলামাবাদ সমঝোতা?
গত ১৭ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যে ১৪ দফার ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’ স্বাক্ষর করেছিল, তা কার্যত ধূলিসাৎ হয়েছে। সেই চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং বেসামরিক জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তার বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে তেল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখন অতীতের বিষয়।
বিশ্লেষকদের মতামত: দরকষাকষির নতুন কৌশল
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলফিরাজ স্কিয়ার্স আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিস্থিতিকে একটি ‘কৌশলগত সংঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সমঝোতা চুক্তিটি পুরোপুরি বিলুপ্ত না হলেও এটি এখন চরম ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। দুই দেশই মূলত তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য নিজেদের অবস্থানকে আলোচনার টেবিলে শক্তিশালী করতে চায়। এই হামলাগুলো মূলত সেই ক্ষমতার দাবার মাঠের অংশ, যেখানে প্রতিটি চালই নতুন উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের ভাষায়—‘জোরজুলুম ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দিন শেষ’। এই পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে দুই দেশই নিজেদের শক্তিমত্তা জাহির করার চেষ্টা করছে, তবে এর চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, যা বিশ্ব রাজনীতিকে এক অনিশ্চিত পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।