ডিজিটাল বিপ্লবের এই সময়ে সংস্কৃতি কি তবে আপন স্বকীয়তা হারাইয়া ফেলিবে? নাকি প্রযুক্তি হইয়া উঠিবে ঐতিহ্য রক্ষার এক নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার? সম্প্রতি হো চি মিন সিটিতে অনুষ্ঠিত 'ভিএইচও - ভিয়েতনাম ক্রিয়েটিভ অ্যাডভার্টাইজিং অ্যাওয়ার্ডস' বা 'ভ্যান জুয়ান অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬'-এর অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হইয়া গেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেমিনার। "সংস্কৃতিতে ডিজিটাল রূপান্তর - উন্নয়নের এক নতুন চালিকাশক্তি" শীর্ষক এই আয়োজনে ভিয়েতনামের শিল্প ও বিজ্ঞাপন জগতের নেতৃবৃন্দ সমবেত হইয়া আলোচনা করিয়াছেন যে, কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তি এবং সৃজনশীলতার সার্থক সমন্বয়ে একটি দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে নতুন উচ্চতায় লইয়া যাওয়া যায়। আজকের এই নিবন্ধে আমরা সেই সেমিনারের বিস্তারিত দিকগুলো আপনাদের নিকট তুলিয়া ধরিতেছি।
প্রযুক্তি ও ডেটার ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে সংস্কৃতির রূপ
সেমিনারে সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তৃণমূল সংস্কৃতি, পরিবার ও গ্রন্থাগার বিভাগের পরিচালক এবং ভ্যান জুয়ান পুরস্কারের আয়োজক কমিটির প্রধান মিসেস নিন থি থু হুয়ং অত্যন্ত সময়োপযোগী কিছু তথ্য তুলে ধরিয়াছেন। তাঁহার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং নিত্যনতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অভাবনীয় বিকাশ এখন কেবল প্রযুক্তির খাতেই সীমাবদ্ধ নাই; বরং এটি যেকোনো দেশের সংস্কৃতি সৃষ্টি, উৎপাদন, প্রচার এবং তা সাধারণ মানুষের নিকট উপভোগ্য করার পুরো প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত বদলে দিতেছে। প্রথাগত উপায়ে আমরা যে সংস্কৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণ করিতাম, ডিজিটাল রূপান্তর তাহাকে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় লইয়া আসিয়াছে। প্রযুক্তি এখানে সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ নহে, বরং ইহা সৃজনশীলতার পরিধিকে বহুদূর প্রসারিত করিবার এক শক্তিশালী মাধ্যম মাত্র।
সংস্কৃতি হলো মূল, প্রযুক্তি হলো হাতিয়ার
ভিয়েতনাম অ্যাডভার্টাইজিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এবং ভ্যান জুয়ান অ্যাওয়ার্ডস আয়োজক কমিটির সহ-চেয়ারম্যান মিঃ নগুয়েন ট্রুং সন একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মূলমন্ত্র দিয়াছেন—"সংস্কৃতি হলো মূল, প্রযুক্তি হলো হাতিয়ার এবং সৃজনশীলতা হলো চালিকাশক্তি।" তাঁহার মতে, ভিয়েতনামের সংস্কৃতির প্রবাহ এর আগে কখনো এমন যুগান্তকারী সুযোগের সম্মুখীন হয় নাই। তবে প্রযুক্তির ভিড়ে যাতে দেশের নিজস্ব ঐতিহ্য, স্বকীয়তা ও মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন যে, ঐতিহ্যগত ও প্রাচীন মূল্যবোধকে আধুনিক অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করার মাধ্যমেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। ভিনামা মিডিয়া জয়েন্ট স্টক কোম্পানির চেয়ারম্যান ত্রান ভিয়েত তান-এর মতেও, প্রযুক্তি কেবল নতুন এক্সপ্রেশন তৈরি করতে পারে এবং ডেটা মানুষের পছন্দ বুঝতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু আসল গভীরতা আসে দেশের নিজস্ব মাটি, মানুষ ও পরিচয় থেকে।
বিজ্ঞাপন শিল্পের ভূমিকা ও ২০৩০ সালের বড় অর্থনৈতিক লক্ষ্য
ডিজিটাল রূপান্তরের এই যুগে বিজ্ঞাপন শিল্পকে শুধুমাত্র সাধারণ প্রচারের মাধ্যম হিসেবে দেখলে ভুল হবে। মিসেস হুয়ং-এর ভাষায় বিজ্ঞাপন হলো মূলত সৃজনশীলতা, আধুনিক প্রযুক্তি, ব্র্যান্ডিং এবং বাজারের এক অপূর্ব মিলনস্থল। ভবিষ্যৎ বিজ্ঞাপন শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বাড়اলেই চলবে না, বরং এর পাশাপাশি ভোক্তা সমাজ এবং দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ বজায় রাখতে হবে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভিয়েতনামের শীর্ষ ১০টি সাংস্কৃতিক শিল্পের মধ্যে বিজ্ঞাপন অন্যতম একটি খাত। ২০৩৫ (দূরদৃষ্টি ২০৪৫) সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভিয়েতনামের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে এই সাংস্কৃতিক শিল্পগুলো থেকে দেশের মোট জিডিপিতে প্রায় ৭% অবদান রাখা, যা এই খাতের বিপুল সম্ভাবনাকে ফুটিয়ে তোলে।
স্বকীয়তা রক্ষা এবং আঞ্চলিক পরিচয় ফুটিয়ে তোলার তাগিদ
স্থানীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হো চি মিন সিটি সংস্কৃতি ও ক্রীড়া বিভাগের কর্মকর্তা ত্রান থান ভুওং একটি বাস্তবসম্মত দিক তুলে ধরেছেন। ডিজিটাল যুগে যখন পৃথিবী আরও ছোট হয়ে আসছে এবং সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে, তখন অন্য দেশের অন্ধ অনুকরণ না করে নিজস্ব স্বকীয়তা ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রজন্মের মাঝে দেশপ্রেম ও নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়লেও ব্র্যান্ড তৈরির ক্ষেত্রে এখনও বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব বেশি দেখা যায়। এই মানসিকতা পরিবর্তন করে স্থানীয় ঐতিহ্য, রন্ধনশৈলী, নগর জীবন এবং আঞ্চলিক অনন্য অভিজ্ঞতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটক ও সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের পরিচয় জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। কারণ ভিয়েতনামে আগত আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীরা প্রায়শই রন্ধনশৈলী, নগর জীবন এবং আঞ্চলিক ঐতিহ্যের অনন্য অভিজ্ঞতার প্রতি সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হন।
পাঠক প্রতিক্রিয়া: এই বিষয়ে আপনার অভিমত
ইতিবাচক দিক: প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করিয়া নিজস্ব শেকড়কে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এটি কেবল অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করিবে না, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে নিজের সংস্কৃতিকে গর্বের সাথে উপস্থাপন করিবার সুযোগ করিয়া দিবে। ডিজিটাল মাধ্যম ও এআই-এর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্য আজ বিশ্বমঞ্চে সহজে পৌঁছাইতে পারে।
চ্যালেঞ্জিং দিক: প্রযুক্তির যান্ত্রিকতায় আমরা যেন আবার নিজেদের মানবিক আবেগগুলো হারাইয়া না ফেলি। অনেক সময় আধুনিকতার চাপে কৃত্রিম বিজ্ঞাপন তৈরি করিতে গিয়া সংস্কৃতির মূল প্রাণ বা 'ইমোশন' হারাইয়া যায়, যা আমাদের অবশ্যই বর্জন করিতে হইবে। অন্ধভাবে বিদেশি সংস্কৃতির অনুকরণ না করিয়া নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ।
পরিশেষে
পরিশেষে বলা যায়, সংস্কৃতি ও ডিজিটাল প্রযুক্তির এই সমন্বয় ভিয়েতনামের জন্য নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করিয়াছে। প্রযুক্তি হইলো আমাদের চলার পথের গতি, কিন্তু সংস্কৃতি হইলো আমাদের গন্তব্য। এই দুইয়ের সঠিক মেলবন্ধনই পারে ভিয়েতনামকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি শক্তিশালী ও সৃজনশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করিতে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সাংস্কৃতিক শিল্প আগামী দিনে দেশের অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিবে বলিয়া আশা করা যায়।
তথ্যসূত্র: মূল উৎস ওয়েবসাইট vietnam.vn থেকে তথ্য সংগ্রহ করিয়া নিজের ভাষায় এই নিবন্ধটি প্রস্তুত করা হইয়াছে।
আরও পড়ুন: সকালের নাশতা বাদ দেওয়ার ক্ষতিকর দিক: ব্যস্ততায় ভুলেও যে ভুল করবেন না

0 Comments