মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তপ্ত পরিস্থিতি ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে বিশ্বরাজনীতি উত্তাল


বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক উত্তেজনা ফের তুঙ্গে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপে এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং ইসরায়েলের বিতর্কিত বসতি স্থাপন প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।


মার্কিন প্রশাসন ও ইরানের অর্থনৈতিক সংঘাত: কোন পথে এগোচ্ছে ওয়াশিংটন?

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি তেহরানের ওপর ইতিহাসের অন্যতম কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হলো সমন্বিত অর্থনৈতিকIsolation বা একঘরেকরণের মাধ্যমে বর্তমান ইরানি শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলা। শুধু তাই নয়, যেসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কড়া বার্তা দিয়েছে হোয়াইট হাউস।

এরই অংশ হিসেবে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নতুন দফায় নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গোষ্ঠীটিকে ইসলামিক রেভল্যুশনি গার্ড কর্পস-কোডস ফোর্সের (IRGC-Qods Force) সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে পুনরায় 'বিশেষভাবে মনোনীত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী' হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাসাদ বোলস সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন যে, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে ইরানের ভূমিকা প্রতিহত করা।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক যুদ্ধের ঘোষণাকে শুরুতেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো নতুন নির্বাহী আদেশ জারি না হওয়ায় সুনির্দিষ্টভাবে কোন দেশগুলো এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসবে, তা স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের এমন হুমকিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হুমকিকে 'অবৈধ ও অমানবিক' বলে আখ্যায়িত করেছে। বিশেষ করে, ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগকে ক্ষমতাচ্যুত করার মার্কিন ষড়যন্ত্রের বার্ষিকীর সঙ্গে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের মিল রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তেহরান। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক এবং মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের ফেলো অ্যালান আয়ার মনে করেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের ভঙ্গুর কাঠামোর মধ্যে এমন বহুমুখী ও কার্যকর নিষেধাজ্ঞা সফল করা প্রায় অসম্ভব। উল্টো তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহের ওপর আক্রমণ চালিয়ে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে।


ইসরায়েলের ই১ (E1) বসতি প্রকল্প ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইরান সংকটের পাশাপাশি ফিলিস্তিন ইস্যুতেও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা লক্ষ করা গেছে। ইসরায়েল কর্তৃক 'ই১' (E1) বসতি প্রকল্পের নতুন নির্মাণ কাজের জন্য দরপত্র আহ্বানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, কানাডা এবং নরওয়ে। যৌথ বিবৃতিতে এই দেশগুলো পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, এই সম্প্রসারণ ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নষ্ট করবে এবং দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা চিরতরে নস্যাৎ করে দেবে।

ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র ও প্রবাসী মন্ত্রণালয় এই যৌথ ঘোষণাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবসম্মত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক আদালতের (ICJ) পরামর্শমূলক মতামতের ভিত্তিতে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখে এমন যেকোনো নির্মাণকাজে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ফিলিস্তিনি প্রশাসনের মতে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাবের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং অবৈধ বসতি স্থাপন চিরতরে বন্ধ করাই কেবল স্থায়ী শান্তির একমাত্র পথ।


বিশ্লেষণমূলক মন্তব্য

ইতিবাচক দিক (Positive Outlook): পশ্চিমা দেশগুলোর যৌথ উদ্যোগে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি, বিশ্বনেতাদের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের আশা বাঁচিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

নেতিবাচক দিক (Negative Outlook): অন্যদিকে, ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আবহ তৈরির ফলে গোটা অঞ্চলে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজারে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।

তথ্যসূত্র: প্রতিবেদনের মূল বিবরণী সংগ্রহ করা হয়েছে Al Jazeera-এর লাইভ কভারেজ ও বিশ্লেষণভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে।

Post a Comment

NextGen Digital Welcome to WhatsApp chat
Howdy! How can we help you today?
Type here...