প্রকৃতির এক মারাত্মক রোষানলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে হিমালয়ান রাষ্ট্র নেপাল এবং তিব্বত সীমান্ত। সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও এর ফলে সৃষ্ট আকস্মিক প্রলয়ঙ্করী বন্যায় প্রাণ হারিয়েছেন শত শত মানুষ। দুর্গম পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসা বরফ, পাথর ও কাদামাটির স্রোত নিমেষেই গিলে খেয়েছে বসতি, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে এখন আন্তর্জাতিক মহলের কাছে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার জোরালো আবেদন জানিয়েছে নেপাল সরকার।
দুর্যোগের ভয়াবহ চিত্র ও ক্ষয়ক্ষতি
গত বুধবার ঘটা এই আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত নেপালে অন্তত ৬২৬ জন এবং চীনের তিব্বতে ৭ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রায় ৩,০০০ মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে নেপালের পাশাপাশি তিব্বতের গ্যিরং কাউন্টি এবং বহুসংখ্যক বিদেশি নাগরিক ও ভারতীয় হিন্দু তীর্থযাত্রী রয়েছেন। উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে গিয়ে দেখা গেছে, তিন দিন আগের এই মৃতদেহগুলোর অনেকগুলোই পচে বিকৃত হয়ে গেছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মহামারীর আশঙ্কায় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে খোলা জায়গায় ডিএনএ স্যাম্পল রেখে এই মরদেহগুলো দাফন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। কাঠমান্ডুর মহারাজগঞ্জ মেডিকেল ক্যাম্পের বাইরে স্বজনদের ভিড় এবং গেটে টাঙানো লাশের ছবির পিন্ডুলি এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করেছে।
ত্রাণ ও পুনর্গঠনে বিশাল আর্থিক সংকট
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে জানিয়েছেন, এই বিশাল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে দেশকে পুনরায় গড়ে তুলতে প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এটি কেবল একটি প্রাথমিক অনুমান, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এখনও চলছে। অন্যদিকে, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তাদের মূল সংকট সাধারণ উদ্ধারকাজে নয়, বরং সুড়ঙ্গে আটকে পড়া মানুষ উদ্ধার, ভেঙে যাওয়া সেতু মেরামত করে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করা, এবং ডিএনএ টেস্টসহ মৃতদেহ শনাক্তকরণের মতো বিশেষায়িত কারিগরি সহায়তায়।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বর্তমান পরিস্থিতি
বিপদগ্রস্ত এই দেশটির পাশে দাঁড়াতে শুরু করেছে প্রতিবেশী দেশগুলো। ভারত ইতোমধ্যে কম্বল, ওষুধ ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ প্রায় ৬০ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে এবং একটি টানেল রেসকিউ টিম ও মেডিকেল টিম পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি চীনও সীমান্তবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছে। আবহাওয়া খারাপ থাকায় গত শনিবার সাময়িকভাবে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হলেও, সীমান্ত এলাকার একটি বিপজ্জনক হ্রদ উপচে পড়ার ঝুঁকি কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ।
বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন
ইতিবাচক দিক: এই মারাত্মক সংকটের মুহূর্তেও নেপাল সরকারের দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া এবং ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর তাৎক্ষণিক ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে আসা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিএনএ সংগ্রহ ও সীমান্ত যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ সংকট মোকাবিলায় এক ইতিবাচক পদক্ষেপ।
নেতিবাচক দিক: পাহাড়ি অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক হিমবাহ ধস এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়াবহ বার্তা দেয়। এছাড়া নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষের স্বজনদের অন্তহীন অপেক্ষা এবং পচে যাওয়া লাশ দাফনের বাধ্যবাধকতা এই ট্র্যাজেডির এক নির্মম ও অন্ধকার দিক।
