হাতীবান্ধায় সাপের কামড়ে ৩ বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় খৈয়া গোখরার কামড়ে ৩ বছরের শিশুর মৃত্যুর ঘটনা। সঠিক সময়ে হাসপাতালে না গিয়ে ওঝার অপচিকিৎসার করুণ পরিণতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদ

 
হাতীবান্ধায় সাপের কামড়ে শিশুর মৃত্যু, সাপের কামড়ে ওঝার অপচিকিৎসা

হাতীবান্ধায় সাপের কামড়ে ৩ বছরের শিশুর মৃত্যু: সচেতনতার অভাব ও ওঝার ভণ্ডামিতে হারাতে হলো আরেকটি প্রাণ


নিজস্ব প্রতিবেদক | লালমনিরহাট:

আমাদের সমাজে আজও কুসংস্কার মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় এবং ওঝা-বৈদ্যের অপচিকিৎসার শিকার হয়ে মাত্র তিন বছর বয়সী এক নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। একটুখানি সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে হাসপাতালে যাওয়ার পদক্ষেপ বাঁচিয়ে দিতে পারত একটি তাজা প্রাণ, কিন্তু তা আর হয়নি।

​ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

​স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছোট্ট ওই শিশুটিকে খৈয়া গোখরা সাপের বাচ্চায় কামড় দেয়। কিন্তু শিশুর পরিবার বিষয়টি বুঝতে ভুল করে এবং পরিস্থিতি গুরুত্বহীন ভেবে আক্রান্ত স্থানে কেবল 'মেরিল' বা কোল্ড ক্রিম জাতীয় কিছু লাগিয়ে বসে থাকে। পরিবারের ধারণা ছিল, এতে হয়তো কোনো সমস্যা হবে না।
​কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বিষক্রিয়া দ্রুত ছড়াতে শুরু করলে শিশুটির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। তখনো হাসপাতালে না নিয়ে পরিবারের লোকজন তাকে এক ওঝার শরণাপন্ন করে। ওঝার আস্তানায় দীর্ঘ সময় নষ্ট করার ফলে মূল্যবান মুহূর্তগুলো হাতছাড়া হয়ে যায়।

​এদিকে খবর পেয়ে মানবিক কারণে এগিয়ে আসেন স্থানীয় সংবাদকর্মী ও সংগঠনের লালমনিরহাট প্রতিনিধি শাহজাহান ভাই। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল ফোনে হাসপাতালের চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে এন্টিভেনম প্রয়োগের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখেন। কিন্তু ওঝার অপচিকিৎসা ও ঝাড়ফুঁকের পেছনে প্রায় তিন ঘণ্টা মূল্যবান সময় নষ্ট করার পর যখন শিশুটিকে হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বা হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি না ফেরার দেশে চলে যায়।

​সচেতনতার ঘাটতি এবং আমাদের সমাজ

​এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক নির্মম চিত্র ফুটিয়ে তোলে। সাপের কামড়ের মতো মারাত্মক একটি বিষাক্ত পরিস্থিতিতেও মানুষ এখনো আধুনিক চিকিৎসালয়ের পরিবর্তে ওঝা বা কবিরাজের ওপর অন্ধ ভরসা রাখে। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, সাপের কামড়ের একমাত্র এবং শতভাগ কার্যকরী চিকিৎসা হলো হাসপাতালে দ্রুত এন্টিভেনম (Antivenom) প্রয়োগ করা। সেখানে কোনো ওঝা বা ঝাড়ফুঁক জীবন বাঁচাতে পারে না। এই ধরনের অপচিকিৎসা কেবল রোগীর অবস্থাকে জটিলই করে তোলে।
​আমরা কি আসলেই একটি সচেতন বাংলাদেশ দেখতে পাবো? নাকি এভাবেই বারবার কুসংস্কারের বলি হতে হবে আমাদের কোমলমতি শিশুদের? এই প্রশ্ন আজ বিবেকবান প্রতিটি মানুষের মনে দোলা দেয়।

​এই বিষয়ে বিশেষ মন্তব্য

​ইতিবাচক দিক (Positive Note):

​এই মর্মান্তিক ঘটনার ভিড়েও মানবতা ও সচেতনতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আমাদের সংগঠনের সম্মানিত পরিচালক ও লালমনিরহাট প্রতিনিধি শাহজাহান ভাই। তিনি খবর পাওয়া মাত্রই নিজে উদ্যোগী হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসকদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং এন্টিভেনমের প্রস্তুতি নিশ্চিত করেছিলেন। তার এই দ্রুত পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, সমাজে এখনও এমন দায়িত্বশীল মানুষ রয়েছেন যারা যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা বোধ করেন না। যদি পরিবার একটু আগে তার এই কথা শুনে শিশুকে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে আসত, তবে হয়তো শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হতো।

​নেগেটিভ দিক (Negative Note):

​অন্যদিকে, আধুনিক যুগে এসেও ওঝা-বৈদ্যের ভণ্ডামি এবং সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতার চরম অভাব অত্যন্ত হতাশাজনক। সাপের কামড় দেওয়ার পর রোগীকে হাসপাতালে না নিয়ে ওঝার কাছে দৌড়ানোর মানসিকতা এক ধরনের আত্মঘাতী অপরাধ। পরিবারের এই খামখেয়ালি পনা এবং কুসংস্কারের অন্ধবিশ্বাস একটি ফুটফুটে শিশুর জীবন কেড়ে নিয়েছে। যতদিন না আমাদের সমাজ থেকে এই কুসংস্কার দূর হবে এবং মানুষ ওঝার ভণ্ডামি ত্যাগ করে চিকিৎসকদের ওপর আস্থা রাখবে, ততদিন আমাদের এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল দেখতেই হবে।

Post a Comment

NextGen Digital Welcome to WhatsApp chat
Howdy! How can we help you today?
Type here...