কুশপুত্তলি দাহ থেকে এক সাংবাদিকের ঘুরে দাঁড়ানোর আত্মকথা

ফ্যাসিস্ট আমলের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মিথ্যা মামলা ও কুশপুত্তলি দাহের শিকার এক নির্ভীক সংবাদকর্মীর ঘুরে দাঁড়ানোর রোমহর্ষক আত্মকথন ও না বলা গল্প।

 
​Bangladesh press club protest

নিউজ ডেস্ক: আমার কুশপুত্তলি দাহ করা হচ্ছে, ঠিক প্রেস ক্লাবের সম্মুখে। তার আগে লাগাতার কয়েকদিন ধরে আমার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা, ঝাড়ু মিছিল ও মানববন্ধনও হয়েছে। তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমার বিরুদ্ধে এ আন্দোলন করেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের কতিপয় উগ্র নেতা-কর্মী। অপহরণ, নারী নির্যাতন, ধর্ষণের অপচেষ্টা, তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও মানহানির মামলা করেও তারা ক্ষান্ত হয়নি, বরং দুর্দান্তভাবে আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে গেছে।


এমন কী অপরাধ ছিল আমার যে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা আমার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা, ঝাড়ু মিছিল ও মানববন্ধনের পাশাপাশি প্রেস ক্লাবের সম্মুখে আমার কুশপুত্তলি দাহ করবে? আমি কি নবীজী অথবা কোনো ধর্মীয় গুরু বা মহাত্মা ব্যক্তিকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ও কটূক্তিমূলক কিছু লিখেছি, বলেছি কিংবা প্রদর্শন করেছি? না কি কোনো ধর্মকে হেয় প্রতিপন্ন ও অবমাননা করেছি? আমি কি নাস্তিক? যে কারণে আমার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সেদিন প্রেস ক্লাবের সম্মুখে কুশপুত্তলি দাহ করা হয়েছিল!


সেই দিন কোথায় ছিল সুশীল সমাজ, কোথায় ছিল অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতা-কর্মীরা? না, কেউ প্রতিবাদ করেনি, কেউ এগিয়ে আসেনি আমার হয়ে কিছু করতে। কারণ একটাই—তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সীমাহীন ক্ষমতার ত্রাস ও ভীতি!


প্রশাসনিক সহায়তা ও জীবনের কঠিন বাস্তবতার দিনগুলি

তবে, আমার হৃদয়গ্রন্থ থেকে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই তৎকালীন জেলা প্রশাসক শামীম আল রাজী মহোদয় ও পুলিশ সুপার রুহুল আমিন শিপার মহোদয়কে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের বাঘা বাঘা জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী নেতাদের উপেক্ষা করে তারা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থেকে আমাকে গোপনে সাহস জুগিয়েছিলেন এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন। সেই সঙ্গে সহযোগিতা পেয়েছি সাংবাদিক স্বরূপ বক্সি বাচ্চু ভাইয়ের কাছ থেকে (যিনি বর্তমানে প্রেস ক্লাবের সভাপতি হলেও সেসময় ছিলেন সাধারণ সদস্য), যিনি অত্যন্ত গোপনে আমার হয়ে কাজ করেছিলেন। তৎকালীন ডিসি এবং এসপি মহোদয় ও বাচ্চু ভাইয়ের দেওয়া সাহস, ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা যদি না পেতাম, তবে এতদিন হয়তো আমার শরীরের হাড্ডিগুলোও আর খুঁজে পাওয়া যেত না। আসলে সবকিছুর ফয়সালাকারী একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, তাই তো এখনো বেঁচে আছি।


আমি কারো বিরুদ্ধে কোনো রিপোর্ট করলে তা মিথ্যা হলে তারা আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে পারত, প্রতিবাদলিপি পাঠাতে পারত। প্রতিবাদ প্রকাশিত না হলে তথ্যপ্রযুক্তি অথবা মানহানি মামলা করতে পারত। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি আর মানহানি মামলা শুধু নয়, অপহরণ, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের অপচেষ্টার মামলা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, আমার বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন করেছে। তাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—যেভাবেই হোক, এবার 'শাহী'কে শেষ করতে হবে। আমার ছবি দিয়ে ডিজিটাল প্লেকার্ড, বড় বড় পোস্টার ও ব্যানার তৈরি করে প্রতিবাদ সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, ঝাড়ু মিছিল ও মানববন্ধনের পাশাপাশি কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, নিউজের কারণে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দিনাজপুর, রাজধানী ঢাকা কিংবা বাংলাদেশের কোনো জেলা-উপজেলা তো দূরের কথা, পৃথিবীর কোথায় এমন ঘটনা ঘটেছে কি না তা আমার জানা নেই।


রাজনীতি ও আমার সাহিত্য-সংস্কৃতির দুনিয়া

গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে যেকোনো অপরাধ বা অবমাননার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মাধ্যম। আমি মিথ্যে রিপোর্ট করে কারো ক্ষতি করে থাকলে আমার বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়ায় আমার শাস্তি নিশ্চিত না করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা-কর্মী কেন আমার বড় ক্ষতি বা আমার পতন কিংবা নিঃশেষ করে ফেলার অপচেষ্টা করেছিল, তা আমার আজও বোধগম্য নয়। আমার প্রতি কেন এত পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ছিল, সেটারও কোনো সঠিক কারণ খুঁজে পাইনি। আমি বিবেকের বিচারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে থেকে সমাজে ঘটে চলা যেকোনো অসঙ্গতি, দুর্নীতি বা অবিচারের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদ করেছি এবং এখনো করছি। নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ বা লাভের জন্য নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে কোনো দলীয় মন্ত্রী, হুইপ বা এমপির সঙ্গে কি ঘুরেছি? তাদের সঙ্গে মঞ্চে উঠেছি, বক্তৃতা দিয়েছি বা কারো জন্য ভোট চেয়েছি?


আমি কি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম? আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, তাঁতীলীগ, কৃষকলীগ, মৎস্যজীবী লীগ, বুদ্ধিজীবী লীগ, সাংস্কৃতিক লীগ বা অন্য কোনো লীগ, পার্টি কিংবা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কি আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল? আমি মূলত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রিয় মানুষ। কবিতা ও গান আমার জীবনের খোরাক। কবিতা লিখি, গান গাই, মঞ্চে অভিনয় করি। আমি যেমন স্বাধীনতার আহ্বানকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোবাসি, তেমনি ভালোবাসি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। বঙ্গবন্ধুকে অনেকেই ভালোবাসেন, কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের অগণতান্ত্রিক শাসনামলে তাঁকে বিতর্কিত করে তোলা হয়েছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা-কর্মীদের চরম অত্যাচারে সেসময় আমি সম্পূর্ণ অসহায় ছিলাম, তাই নিজেকে একটু নিরাপত্তার বেড়াজালে রাখতে বাধ্য হয়ে 'বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট'-এর ব্যানারে নাম লিখিয়েছিলাম।


ক্ষোভহীন মন নিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা ও শেষ কথা

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাকে বিভিন্ন ইভেন্টে যেতে হয়, যেখানে পরিস্থিতির কারণে অনেকের সঙ্গেই আলাপচারিতা ছাড়াও সেলফি তুলতে হতে পারে। সেটা বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ বা অন্য যেকোনো দলের নেতা-কর্মীর সঙ্গেই হতে পারে। দীর্ঘদিনের পুরনো কোনো ছবি দেখিয়ে কেউ যদি প্রমাণ করতে চায় আমি অমুক দলের, তবে তাকে অবশ্যই সঠিক প্রমাণ দিতে হবে। অন্যথায় তাকে পরকালে সৃষ্টিকর্তার দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। তাহলে কেন আমার পেছনে ছুটে কিছু মানুষ অযথা নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করছেন? আপনি যদি কোনো কারণে আমার প্রতি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে থাকেন কিংবা কোনো ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়ে থাকি আমি, তবে বিষয়টি সরাসরি খুলে বলতে পারেন। কারো বিরুদ্ধে আমি কোনো বিচার চাইব না, নিজের ভাগ্যকে নিঃসংকোচ চিত্তে মেনে নিয়েছি। হয়তো অতীতে কোনো ভুল করেছি, আর তারই ফল হাতেনাতে পেয়েছি। কষ্ট তো অবশ্যই আছে, তবে কারো প্রতি কোনো রাগ বা ক্ষোভ নেই। আমার প্রতি আজও যদি কারো কোনো ক্ষোভ থেকে থাকে, তবে আমি নিঃশর্তভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।


কারো বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ বা অনুযোগ নেই। দিন শেষে মনে হয় যেন সব ভুলের কারণ আমি নিজেই, আমিই সেই হতভাগা। তবুও কাউকে এক বিন্দুও দোষ দিতে চাই না। কিছু মানুষ আমার জীবনে এসেছে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা হয়ে, আর কিছু সম্পর্ক শেষ হয়েছে আমার নিজের ভুলগুলো চিনিয়ে দিয়ে। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমার দায়িত্বটা অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই থাকে, আর এই কারণেই বোধহয় আমার দোষের অন্ত নেই। সব দোষ মাথা পেতে মেনেই আমি অন্তর মহাশয়কে সাক্ষী রেখে প্রতিটি দায়িত্ব সাধ্যমতো পালন করার চেষ্টা করে গেছি। করুণাময় সৃষ্টিকর্তা আমাকে যতটুকু করুণা ও সামর্থ্য দিয়েছেন, তার দ্বারাই আমি আমার পরিবার ও সমাজকে সুখী করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। বাকি সমস্ত কাজটুকু আমি তারই ওপর সঁপে দিয়েছি। তিনিই একমাত্র দাতা এবং তিনিই সবকিছুর গ্রহীতা। তার দরবারে আমার একটুমাত্র প্রার্থনা, হে করুণাময়, আমাকে অফুরন্ত ধৈর্য দান করুন। আমীন।


পাঠক প্রতিক্রিয়া ও মূল্যায়ন

ইতিবাচক দিক: এই লেখায় একজন সাংবাদিকের সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার যে মানসিক শক্তি ফুটে উঠেছে, তা অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। চরম রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্যেও নৈতিকতা না হারিয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার এই সংগ্রাম বর্তমান সমাজের জন্য একটি বড় বার্তা।


নেতিবাচক দিক: অতীত সংকটের সময় আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে বিষয়টির মোকাবিলা না করে কিছুটা আত্মরক্ষামূলক বা সমঝোতার পথ বেছে নেওয়া এবং বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কৌশলগত যুক্ত হওয়ার বিষয়টি পেশাগত আদর্শের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রশ্ন বা বিতর্কের অবকাশ তৈরি করতে পারে।

Post a Comment

NextGen Digital Welcome to WhatsApp chat
Howdy! How can we help you today?
Type here...