ফিফায় ক্ষমতা দ্বন্দ্ব ও ইনফান্তিনোর পাশে ট্রাম্প: বিশ্ব ফুটবলে নতুন মেরুকরণ

Gage Skidmore


বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA)-র শীর্ষ পদে অস্থিরতা দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পদত্যাগের জোর দাবি তুলেছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের একাধিক প্রভাবশালী কনফেডারেশনের শীর্ষ কর্তারা। তবে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বিশ্ব ফুটবল রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইনফান্তিনোকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে ফিফা এক ‘ভয়ঙ্কর ভুল’ করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেয়া এক বার্তায় ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সভাপতির ভূমিকা প্রশংসনীয় এবং কোনো অবস্থাতেই ফিফার উচিত হবে না তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারিত করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা। ইতালিয়ান-সুইস বংশোদ্ভূত এই বিশ্ব ফুটবল সংগঠককে তিনি অত্যন্ত দক্ষ ও সফল কর্মকর্তা হিসেবে আখ্যা দেন।

বাণিজ্যিক বিতর্ক ও মহাদেশীয় সংস্থাগুলোর তোপ

ইনফান্তিনোকে কেন্দ্র করে ফিফার অভ্যন্তরীণ মতভেদ ও অসন্তোষ ইতোমধ্যে চরম রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব (Commercial Rights) সম্পর্কিত একটি প্রস্তাবিত পরিকল্পনাকে ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। অভিযোগ রয়েছে, ইনফান্তিনো বিশ্বকাপের একটি বড় বাণিজ্যিক অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যদিও পরিকল্পনাটি বাতিল করা হয়েছে, তবুও ইউরোপিয়ান ফুটবল সংস্থা (UEFA), উত্তর-মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল (CONCACAF) এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (AFC) এক যৌথ বার্তায় সভাপতির এই আচরণকে ‘গভীর বিচারিক ব্যর্থতা’ এবং ফুটবল কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।

উক্ত যৌথ নথিতে ইউরোপীয় সকার প্রধান আলেকসান্দার চেফেরিন, কনক্যাকাফ প্রধান ভিক্টর মন্তাগলিয়ানি এবং এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফাসহ সংস্থাগুলোর প্রশাসনিক প্রধানগণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছেন। ফিফা কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, একটি বিশেষ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ইনফান্তিনো ও ফিফার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে, মহাদেশীয় গভর্নিং বডিগুলোর পাল্টা প্রতিক্রিয়া—ফুটবল কোনো একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, বরং এটি বিশ্ব ক্রীড়াপ্রেমীদের যৌথ আমানত।

সংকটের রাজ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব

আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ফিফার অভ্যন্তরীণ এই লড়াই কেবল একটি চেয়ার কেন্দ্রিক নয়, বরং এটি ফুটবলের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও স্বায়ত্তশাসনের লড়াই। ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিতভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আয়োজিত বা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ফুটবল ইভেন্টগুলোর ক্ষেত্রে নীতিগত প্রভাব ফেলতে পারে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও ক্রীড়া খাতের এমন অস্থিরতার প্রভাব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দৃশ্যমান, যা নিয়ে আমরা আমাদের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরেছিলাম দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ: জাতীয় রাজনীতির সাম্প্রতিক চিত্র শীর্ষক আলোচনায়।


ঘটনার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ও মন্তব্য

পজিটিভ পর্যবেক্ষণ (ইতিবাচক দিক): বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন কর্তৃক সমর্থন পাওয়া যেকোনো সংস্থার প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক হতে পারে। ট্রাম্পের স্পষ্ট অবস্থান ফিফাকে তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখবে এবং আলোচনার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দূর করে বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টগুলোর বাজারমূল্য নিশ্চিত করার একটা সুযোগ তৈরি করবে।

নেগেটিভ পর্যবেক্ষণ (সীমাবদ্ধতা ও নেতিবাচক দিক): একটি স্বাধীন ক্রীড়া সংস্থায় সরাসরি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ বিশ্ব ফুটবলের নিরপেক্ষতা ও স্বায়ত্তশাসনের ওপর বড় আঘাত। উপরন্তু, উয়েফা, কনক্যাকাফ ও এএফসি-র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক বোর্ডগুলোকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা ফিফাকে একটি বড় ধরনের বিভাজনের (Schism) দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা সাধারণ ফুটবলপ্রেমী ও স্বনামধন্য স্পন্সরদের আস্থা ক্ষুণ্ন করবে।


তথ্য যাচাই ও প্রাথমিক সূত্র: jagonews24.com