মুসলিম বিশ্বের প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থা ওআইসি বা অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশনের নেতৃত্বে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ৫৭টি সদস্যরাষ্ট্রের এই প্রভাবশালী জোটে নতুন মহাসচিব হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মৌরিতানিয়ার বিশিষ্ট কূটনীতিক ও দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসমাইল উলদ শেখ আহমেদ। সৌদি আরবের বন্দরনগরী জেদ্দায় অবস্থিত ওআইসির কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাউন্সিলের ২৩তম বিশেষ অধিবেশনে এই পরিবর্তন আসে। সদ্য বিদায়ী মহাসচিব হুসেইন ইব্রাহিম ত্বহার স্থলাভিষিক্ত হলেন তিনি। অধিবেশন চলাকালীন সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সরাসরি উপস্থিতি ও সর্বসম্মতিক্রমে তিনি নতুন পদে শপথ নেন।
দায়িত্ব গ্রহণের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইসমাইল উলদ শেখ আহমেদ বলেন, দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক এবং নিজ দেশের কূটনৈতিক মাঠে কাজ করার পর ওআইসির মতো বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন ও সম্মানের বিষয়। মুসলিম উম্মাহর এই বৃহৎ প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্ব দেওয়াকে তিনি অত্যন্ত গৌরবের বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তিনি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন যে, সদস্যরাষ্ট্রগুলো তাঁর ওপর যে আস্থার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তা কেবল কথার মিষ্টি বাক্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী কাজের মাধ্যমেই তিনি সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করবেন।
ফিলিস্তিন সংকট ও আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা
ওআইসির এই বিশেষ অধিবেশনে ফিলিস্তিনের জোরালো কণ্ঠস্বর হিসেবে বক্তব্য রাখেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ড. ভারসেন আগাবেকিয়ান শাহিন। শুরুতেই এই বিশেষ অধিবেশন আয়োজন করার জন্য এবং ফিলিস্তিনের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদী ও অটল সমর্থনের কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বক্তব্যের একপর্যায়ে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ফিলিস্তিনি মন্ত্রী অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে ইসরায়েল এখনো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্রে সামরিক আগ্রাসন ও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার মুখোমুখি না হওয়ার সুযোগ পাওয়ায় ইসরায়েলি প্রশাসন এ ধরনের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড চালাতে আরও বেশি উৎসাহ পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিশেষ করে পশ্চিম তীরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অবৈধ বসতি স্থাপন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং এই সমস্ত জবরদখলমূলক কার্যক্রমে যারা অর্থায়ন করছে, তাদের দ্রুত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসার জোরালো দাবি জানান তিনি।
আল-আকসা মসজিদের পবিত্রতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি
ফিলিস্তিনি মন্ত্রী ড. ভারসেন আগাবেকিয়ান শাহিন তাঁর বক্তব্যে আল-কুদস তথা পবিত্র জেরুজালেম এবং ঐতিহাসিক আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী ও উগ্রপন্থীদের ধারাবাহিক অনুপ্রবেশ ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, পবিত্র এই প্রাঙ্গণে প্রতিনিয়ত যেসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, তা মূলত জেরুজালেমের বহু পুরোনো ঐতিহাসিক ও আইনগত স্ট্যাটাসকো বা অবস্থান চিরতরে বদলে ফেলার একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। এই ধরনের উসকানি কেবল ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের ভঙ্গুর শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার একটি সরাসরি হুমকি।
বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন
ইতিবাচক দিক: ওআইসির মতো এত বড় একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় মৌরিতানিয়ার অভিজ্ঞ কূটনীতিক ইসমাইল উলদ শেখ আহমেদের মতো দক্ষ নেতার আগমন মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে নতুন গতি আনতে পারে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো কূটনৈতিক লবিং তৈরিতে তাঁর পূর্বের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নেতিবাচক দিক: বিগত দশকগুলোতে ওআইসি বিভিন্ন বড় সংকটের সময় কেবল নিন্দা প্রস্তাব পাস করা কিংবা বিবৃতি প্রদানেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। নতুন মহাসচিব যতই বাস্তবভিত্তিক কাজের প্রতিশ্রুতি দিন না কেন, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ অনৈক্যের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও ফিলিস্তিনি সংকট নিরসনে সংস্থাটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে এখনও গভীর সংশয় রয়েছে।
