ঘুস.সাইট ও কিশোর শাহেদকে নিয়ে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে বৈঠক

মায়ের পেনশনের ঘুস দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ওয়েবসাইট তৈরি করা কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক।
ঘুস.সাইট ও কিশোর শাহেদকে নিয়ে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে বৈঠক


মায়ের পেনশনের ঘুস দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ওয়েবসাইট তৈরি করা কিশোর শাহেদকে নিয়ে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা

পাসপোর্ট তৈরি ও প্রয়াত শিক্ষিকা মায়ের পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে পদে পদে প্রশাসনিক হয়রানি আর ঘুসের শিকার হয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এক কিশোর। প্রচলিত ব্যবস্থার এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিনব পন্থায় প্রতিবাদ জানাতে সে গড়ে তোলে ‘ঘুস.সাইট’ নামের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে এই ওয়েবসাইটে হাজারও মানুষের কাছ থেকে শতকোটি টাকার দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য জমা পড়ে, যা মুহূর্তেই দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই তরুণ উদ্যোক্তার সাহসী পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, সম্প্রতি ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকনের নিজ কার্যালয়ে কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে আয়োজিত এই বৈঠকে শাহেদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ, এর ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং এই প্ল্যাটফর্মটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে কী ধরনের লজিস্টিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন, তা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। এর ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও এই কিশোরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়, যা তার এই প্রতিবাদী কার্যক্রমের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বৈঠক শেষে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক গণমাধ্যমকে জানান, জেন-জি প্রজন্মের এই তরুণদের দেশ ও সমাজের প্রতি যে আন্তরিক দায়বদ্ধতা রয়েছে, শাহেদের কার্যক্রমে তারুণ্যের সেই অপ্রতিরোধ্য গতি লক্ষ্য করা গেছে। ‘ঘুস.সাইট’ প্রকল্পের মাধ্যমে সে যে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে খুব দ্রুতই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রশাসকের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর জনসচেতনতামূলক উদ্যোগগুলো সমাজ থেকে অনিয়ম দূর করতে এবং সমঅধিকারভিত্তিক একটি স্বচ্ছ রাষ্ট্র গঠনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

অন্যদিকে, শাহেদ তার এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের পরিধি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। তার ভাষ্যমতে, ওয়েবসাইটের সার্ভারে জমা পড়া হাজার হাজার অভিযোগের বিগ ডেটা বা উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে চায় দেশের কোন কোন সরকারি বিভাগ বা খাতে দুর্লভ ও অনিয়ন্ত্রিত ঘুসের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতিনির্ধারক সংস্থাকে দুর্নীতি দমনে সহায়তা করার এক সুদূরপ্রসারী মানসিকতাও তার রয়েছে।

তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ একা পরিচালনা করতে গিয়ে বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে শাহেদ। তার দৈনন্দিন পড়াশোনা ও স্বাভাবিক ছাত্রজীবন এই প্রজেক্টের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যদি কোনো সরকারি স্বীকৃতি বা প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায়, তবে কাজের চাপ কিছুটা হালকা হবে এবং সে পড়াশোনার পাশাপাশি এই মহৎ উদ্যোগটি নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করে।

উল্লেখ্য, এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল শাহেদের ব্যক্তিগত এক তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে। প্রয়াত শিক্ষিকা মায়ের পেনশনের ফাইল ছাড় করাতে গিয়ে শিক্ষা বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার পক্ষ থেকে বারবার অনৈতিক সুবিধা বা ঘুস দাবি করা হয়। পরবর্তী সময়ে নিজের পাসপোর্ট বানাতে গিয়েও তাকে একই ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। এ ধরনের অনিয়ম দেখে আর চুপ থাকতে না পেরে গত ২১ আগস্ট সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে সে এই প্রতিবাদী ওয়েবসাইটটি জনসমক্ষে আনে।

এই খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর টনক নড়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। নড়েচড়ে বসা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস দ্রুত সময়ের মধ্যে শাহেদের মায়ের পেনশন সংক্রান্ত আটকে থাকা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অনুলিপি যাচাই-বাছাই করে তা সমাধানের চূড়ান্ত উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি, প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দুই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীকে তাৎক্ষণিকভাবে কারণ দর্শানোর বা শোকজ নোটিশ প্রদান করা হয়েছে।


বিশেষ বিশ্লেষণ: ইতিবাচক ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

  • ইতিবাচক দিক: এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পজিটিভ দিক হলো, এটি সাধারণ মানুষকে নিজেদের নাম প্রকাশ না করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার এক নিরাপদ ও ভয়হীন ডিজিটাল মাধ্যম উপহার দিয়েছে। পাশাপাশি, প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে একজন সাধারণ কিশোরের এই প্রতিবাদকে সাধুবাদ জানানো এবং তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া দেশের অন্য তরুণদেরও অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে প্রবলভাবে উৎসাহিত করবে।
  • নেতিবাচক দিক: অন্যদিকে, এই প্ল্যাটফর্মটির প্রধান ঝুঁকি হলো বেনামে আসা অভিযোগগুলোর শতভাগ সত্যতা যাচাই করার কোনো ফিল্টারিং ব্যবস্থা না থাকা। অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রোশ বা শত্রুতার জেরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া অভিযোগ যুক্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে। তাছাড়া, আইনি সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকআপ ছাড়াই একজন কমবয়সী শিক্ষার্থীর পক্ষে এত বড় দুর্নীতিবিরোধী ডেটাবেজ পরিচালনা করা তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আইনি জটিলতার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

Post a Comment

NextGen Digital Welcome to WhatsApp chat
Howdy! How can we help you today?
Type here...