রাস্তা দিয়ে একাই হেঁটে যাচ্ছিল সোহাগ। হঠাৎ করেই চারপাশটা এমন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢেকে গেল যে চোখের পলক ফেলাও দায় হয়ে দাঁড়াল। কোথাও এক ফোঁটা আলো নেই, চারপাশের চেনাজানা রাস্তাটাও যেন মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। কী হচ্ছে বুঝতে না পেরে সোহাগ পকেট থেকে ফোনটি বের করে ফ্ল্যাশলাইট অন করল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! আলো জ্বলার সাথে সাথেই তার হাতের ফোনটি প্রচণ্ড শব্দে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
মুহূর্তের মধ্যে চারদিকটা অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। একটু পর যখন ঝাপসা আলো ফিরে এল, সোহাগ দেখল সে এমন এক অচেনা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে সে জীবনেও কখনো আসেনি। ঠিক তখনই চারপাশ থেকে ভেসে আসতে শুরু করল হাজার হাজার, কোটি কোটি মানুষের হাহাকার ও কান্নার আওয়াজ। মনে হচ্ছিল, একসঙ্গে লাখো মানুষকে কেউ অকথ্য নির্যাতন করছে। সেই আর্তনাদে সোহাগের বুক কেঁপে উঠল।
কান্নার সেই বিকট শব্দগুলো হঠাৎ করেই চিরতরে থেমে গেল। চারপাশটা আবার একটু আলোময় হয়ে উঠল—তবে সেটা কোনো সূর্যের আলো নয়, ঠিক যেমনটা ফজরের আজানের আগের ঝাপসা আলো থাকে, তেমনি এক অদ্ভুত আলো। সেই মায়াবী আলোয় সোহাগ দেখল, তার চারপাশে বেশ কয়েকটি গাঢ় কালো ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।
ছায়াগুলোর মধ্য থেকে একটা সামনে এগিয়ে এসে ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল, "তুই কে? এখানে কেন আসলি?" কাঁপতে কাঁপতে সোহাগ জবাব দিল, "আমি... আমি জানি না। আমার নাম সোহাগ। আমি এখানে কীভাবে এলাম, কিচ্ছু জানি না।" কথাটা শুনে কালো ছায়াটি বিকট হেসে বলল, "জানিস না? একদিন তোকেও মরতে হবে। আমাদের মতো এই অন্তহীন যন্ত্রণায় ভুগতে হবে তোকেও। আমরা এখানে কত যুগ ধরে আটকে আছি! কখনো তোর মৃত্যু হবে না। শুধু তোর শরীর থেকে সমস্ত শক্তি শুষে নেবে এক অদ্ভুত প্রাণী।"
ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে সোহাগ চারপাশে তাকাতে গিয়ে শিউরে উঠল। সে দেখল, চারপাশের গাছগুলোতে কোনো পাতা নেই। কিন্তু প্রতিটি গাছের ডালে ডালপালা নয়, যেন একেকটি জীবন্ত লাশ বা কালো ছায়ার অবয়ব বন্দি হয়ে ঝুলে আছে! কম্পিত কণ্ঠে সোহাগ বলল, "তোমরা কারা? আমার কোনো ক্ষতি করবে না তো?" একটি ছায়া উত্তর দিল, "সামনে যত গাছ দেখছিস, এগুলো একটাও গাছ নয়। এগুলো একেকজন মানুষের অবয়ব। আচ্ছা সোহাগ, বল তো আজ কত তারিখ?" সোহাগ ভয়ে ভয়ে বলল, "এখন তো ২০২৬ সাল চলছে... ১ জানুয়ারি।" তার কথা শুনে কিছু ছায়া কান্নায় ভেঙে পড়ল। একজন ফুঁপিয়ে বলে উঠল, "আমি এখানে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর ধরে পড়ে আছি! আমার মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে না।" আরেকজন আর্তনাদ করে বলল, "তুই তো মাত্র সাড়ে চার হাজার বছর বলছিস! আমি এখানে পনেরো হাজার বছর ধরে বন্দি। আমার শরীর থেকে শক্তি সব কেড়ে নেওয়া হয়েছে, আজ কারও সাথে লড়াই করার শক্তিটুকুও আমার নেই।"
সোহাগের মাথা তখন ঘুরছিল। সে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠল, "এসব কী হচ্ছে? এটা কীভাবে সম্ভব?" ঠিক তখনই ছায়াগুলোর মধ্যে থেকে লম্বা ও সবচেয়ে অন্ধকার এক অবয়ব সামনে এগিয়ে এল। সে তাদের সর্দার। গম্ভীর কণ্ঠে সে বলল, "সোহাগ, তুই কি ভাবছিস এখান থেকে জীবিত ফিরে যাবি? দেখ, আমরা হাজার হাজার বছর ধরে এখানে পড়ে আছি। আমাদের সময়টাকে এখানে থমকে দেওয়া হয়েছে। এখানে কখনো ভোরের সূর্য ওঠে না, চিরকাল এই অভিশপ্ত অন্ধকারেই থাকতে হয়।"
কিন্তু সোহাগ হার মানতে নারাজ। সে দৃঢ় গলায় কালো ছায়াগুলোকে বলল, "এখানে আসার যখন একটা রাস্তা আছে, তখন এখান থেকে যাওয়ার বা বাঁচারও কোনো না কোনো উপায় নিশ্চয়ই আছে!"
তার কথা শুনে একটা কালো ছায়া ধীর পায়ে এগিয়ে এল। বিষণ্ণ গলায় সে বলল, "এখান থেকে জীবিত বের হওয়া যায় কি না আমরা জানি না। তবে এখান থেকে মুক্তি পেতে হলে এবং আমাদের বন্দিদশা কাটাতে হলে একটিমাত্র কাজ করতে হবে। যে অশুভ ছায়াটি আমাদের এই দশা করেছে, আমাদের সমস্ত শক্তি কেড়ে নিয়ে নিজের শক্তি বাড়িয়ে চলেছে—সবার আগে তাকে খতম করতে হবে।"
ভ্রু কুঁচকে সোহাগ জিজ্ঞেস করল, "সে কে? কেন এভাবে নিরপরাধ মানুষদের এনে এখানে কষ্ট দিচ্ছে?"
কালো ছায়াটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল, "সে আমাদের শরীরের সমস্ত শক্তি আর অস্তিত্ব ধীরে ধীরে শুষে নিচ্ছে। নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ ও তাদের শক্তি সংগ্রহ করার পর, যখন সবার অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে, তখন সে এক ভয়ঙ্কর ও অদ্ভুত প্রাণীর রূপ নেবে। শুনেছি, এরপর সে এই পৃথিবী ধ্বংস করতে বাস্তব দুনিয়ায় ফিরে যাবে। সে হবে পৃথিবীর সবচেয়ে অশুভ ও ক্ষমতাধর এক কালো শক্তি। সে যদি তার এই মিশনে সফল হয়, তবে শুধু আমাদের আর বাঁচার আশা থাকবে না, পুরো পৃথিবীর মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে এবং সেখানে শুধু তার একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম হবে।"
কথাগুলো শোনার পর সোহাগের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল, "আমি অজান্তে কোথায় এসে পড়লাম! এখন যদি আমি এখান থেকে জীবিত ফিরতেই না পারি, তবে শুধু নিজের জীবন নয়—পুরো পৃথিবীকেও যে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়বে! আমাকে যে করেই হোক এই চক্রান্তের শেষ দেখতে হবে।"
