বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা খাতে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান শিপিং কর্পোরেশন COSCO তাদের বাণিজ্যিক জাহাজে বিশেষ ও গোপন নজরদারি সরঞ্জাম ব্যবহার করে আসছে। আমেরিকার অভিযোগ, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে সামরিক যোগাযোগ এবং এনক্রিপশন প্রযুক্তির ওপর গোপনে নজরদারি চালানো হয়। ওয়াশিংটনের দাবি, বাণিজ্যিক জাহাজের আড়ালে এই ইন্টেলিজেন্স কালেকশন প্রোগ্রাম দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে।
অভিযোগের মূল বিষয়বস্তু ও কৌশলগত তৎপরতা
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে যে, এই গোপনীয় সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্মগুলোর সাহায্যে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার জলসীমায় চলাচলকারী বিভিন্ন সামরিক জলযান ও বিমানের যোগাযোগ সিগন্যাল সংগ্রহ করা হয়। চীন সরকার সাধারণত কৌশলগত সামুদ্রিক রুট এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের চাবিকাঠি হিসেবে পরিচিত টার্মিনালগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এই ডেটা ব্যবহার করে থাকে। বিশেষ করে আঞ্চলিক জলসীমার বিরোধ মেটানো এবং বৈদেশিক সামরিক মুভমেন্টের আগাম সতর্কতা পাওয়ার ক্ষেত্রে বেইজিং এই বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগায় বলে মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা।
চীনের অবস্থান ও মার্কিন পদক্ষেপ
এদিকে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এই সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, চীনা আইন বা আন্তর্জাতিক নিয়মের বাইরে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বিদেশের মাটিতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেয় না বেইজিং। অন্যদিকে, পেন্টাগন গত বছরের জানুয়ারি মাসেই COSCO-কে চীনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল। তা সত্ত্বেও মার্কিন সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্কে এই কোম্পানির গভীর সংযোগ থাকায় রাতারাতি তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা বেশ দুরূহ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা। আগামী দিনে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এই বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতাগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণ ও সম্পাদকীয় মূল্যায়ন
ইতিবাচক দিক: বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের বৈচিত্র্য আনয়ন এবং বাণিজ্যের গতিশীলতা বজায় রাখতে COSCO-এর মতো বড় লজিস্টিক নেটওয়ার্কের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। এর ফলে বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহন খরচ সাশ্রয়ী থাকে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে।
নেতিবাচক দিক: বাণিজ্যিক জাহাজের আড়ালে সামরিক নজরদারির এই ধরনের অভিযোগ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে। এতে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের নেতিবাচক ছায়া পড়তে পারে।
