রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
Photo by cottonbro studio from Pexels


উচ্চশিক্ষার সুতিকাগার হিসেবে পরিচিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসিক সংকটের সমস্যা যেন দীর্ঘদিনের এক চিরচেনা অভিশাপ। বিশেষ করে হলের গণরুম বা গেস্টরুমগুলোর মানবেতর পরিবেশ শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বেগম খালেদা জিয়া হলে এমনই এক উদ্বেগজনক ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও হলের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলেছে।

গণরুমে স্ক্যাবিস হানা: যেভাবে আতঙ্কের সূত্রপাত

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, হলের গণরুমে গাদাগাদি করে বসবাসরত ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এক নবীন শিক্ষার্থী সম্প্রতি সংক্রামক চর্মরোগ স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়েছেন। গত সোমবার (১০ আগস্ট) শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার শরীরে এই চর্মরোগ শনাক্ত হয়। এরপর থেকেই হলের অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বেগম খালেদা জিয়া হলের গণরুমে আবাসন সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে বহু অনাবাসিক শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বসবাস করে থাকেন। একটিমাত্র বড় কক্ষে প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থীকে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও গাদাগাদি পরিবেশে দিন কাটাতে হয়। অনেক সময় সিট সংকটের চরম মাত্রায় এক বিছানায় বা বেডে দুজন শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে গাদাগাদি করে ঘুমাতে বাধ্য হতে হয়। এমন চরম জনবহুল ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে একজন সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগী অবস্থান করায় অন্যরাও দ্রুত সংক্রমিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনের উদাসীনতা

এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে গণরুমে অবস্থানরত অনাবাসিক শিক্ষার্থী সুফিয়া আক্তার উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ওই ছাত্রীর আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা বা রোগবালাই ছিল। এখন স্ক্যাবিস আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকে তিনি চরম ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, কারণ আক্রান্ত ছাত্রীটি তার ঠিক পাশের বেডেই অবস্থান করেন।

আরেক শিক্ষার্থী ফারজানা বৃষ্টি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্ক্যাবিস হলো একটি অত্যন্ত দ্রুত ছোঁয়াচে চর্মরোগ, যা সহজেই সংস্পর্শে আসা অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি কক্ষে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসবাস করায় সেখানে কোনোভাবেই এমন একজন সংক্রামক রোগীকে রাখা নিরাপদ নয়। যত দ্রুত সম্ভব হল প্রশাসনের তদারকিতে তাকে আলাদা করে আইসোলেশনে বা সিক রুমে স্থানান্তর করা উচিত।

এদিকে, হলের ভেতরে অসুস্থ বা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের পৃথকভাবে রাখার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক 'সিক রুম' বা বিশেষ চিকিৎসা কক্ষের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আক্রান্ত শিক্ষার্থী সেখানে যাননি। এ বিষয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই আক্রান্ত শিক্ষার্থী জানান, সিক রুমে একা থাকতে তার ভীষণ ভয় করে, যে কারণে তিনি সেখানে যেতে রাজি হননি।

তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, হলের ভেতরে এত বড় একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সংকটের সৃষ্টি হলেও বেগম খালেদা জিয়া হলের প্রভোস্ট ড. শারমিন হামিদ দাবি করেছেন যে, হল থেকে বা অন্য কোনো মাধ্যম থেকে তাকে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি এবং তিনি এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবগত নন। দায়িত্বশীল পদের এমন উদাসীনতা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই ঘটনার বিশ্লেষণ ও সার্বিক মূল্যায়ন

ইতিবাচক দিক (Positive Aspect)

সংবাদ মাধ্যম ও সচেতন শিক্ষার্থীদের কল্যাণে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি জনসমক্ষে চলে আসায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত নড়েচড়ে বসার সুযোগ পাবে। এর ফলে হল প্রশাসন ভবিষ্যতে গণরুমের স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে এবং এ ধরনের ছোঁয়াচে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগেই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হবে, যা সামগ্রিক হলের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

নেতিবাচক দিক (Negative Aspect)

অন্যদিকে, হল প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট তদারকি ও নজরদারির অভাব এবং গণরুমের অমানবিক পরিবেশের বিষয়টি আবারও লজ্জাজনকভাবে উন্মোচিত হলো। প্রভোস্টের অজ্ঞতা প্রমাণ করে যে হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা সুরক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মনিটরিং বা তদারকি করা হয় না, যা আবাসিক হলের প্রশাসনিক কার্যকারিতার বড় একটি ব্যর্থতা।

তথ্য কৃতজ্ঞতা ও তথ্যসূত্র: এই প্রতিবেদনের প্রাথমিক তথ্য যাচাই, সংগ্রহ ও সংবাদ তৈরির ক্ষেত্রে সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে জনপ্রিয় নিউজ পোর্টাল jagonews24.com থেকে।

সম্পর্কিত অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য