![]() |
| ছবি:Shamsul alam66 / Wikimedia Commons |
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিজ দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার কূটনৈতিক আবেদন বা বন্দি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে এবার নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছে ভারত। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে— বিষয়টি তারা দেশের প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় রেখেই গভীরভাবে মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ও সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যুটি নিয়ে কথা বলেন মন্ত্রণালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। ব্রিফিংকালে সাংবাদিকরা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণ সম্পর্কিত বিষয়ে জানতে চাইলে জয়সওয়াল জানান, পুরো বিষয়টি তাদের নিজস্ব সুনির্দিষ্ট প্রথা ও আইনি বিধিবিধান অনুসরণ করেই সামনে এগোচ্ছে।
ঢাকা-নয়াদিল্লি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই প্রেস ব্রিফিংয়ের ঠিক এক দিন আগে কূটনৈতিক অঙ্গনে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ওই বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত আনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হয়।
এ ছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের জনপ্রিয় মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত দুই আসামিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রণধীর জয়সওয়াল বিষয়টিকে সম্পূর্ণ একটি 'আইনি প্রক্রিয়া' হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এ ঘটনা সংক্রান্ত আইনি তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে।
প্রসঙ্গগত উল্লেখ্য, বিগত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বুকেই সন্ত্রাসী গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন শরিফ ওসমান হাদি। পরবর্তীতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসারত অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই ট্র্যাজিক হত্যাকাণ্ডের প্রধান দুই সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে চলতি বছরের মার্চ মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (STF) গ্রেপ্তার করে।
সীমান্ত নিরাপত্তা, র-প্রধানের ঢাকা সফর ও ব্রিকস সম্মেলনের নিমন্ত্রণ
ঢাকায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র' (RAW)-এর শীর্ষ কর্মকর্তা পরাগ জৈনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার গোপন বৈঠকের খবরের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখপাত্র জয়সওয়াল জানান, এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো আগাম তথ্য নেই। তিনি বিষয়টির বিশদ বিবরণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে যেমন বড় ধরনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার রদবদল নিয়ে নানান কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়— যা আমরা আমাদের অন্য প্রতিবেদনে ফিফায় ক্ষমতা দ্বন্দ্ব ও ইনফান্তিনোর পাশে ট্রাম্প: বিশ্ব ফুটবলে নতুন মেরুকরণ নিয়ে আলোচনা করেছি— ঠিক তেমনই দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক রাজনীতিতেও এক নতুন কূটনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আসন্ন সেপ্টেম্বরে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ পাঠাবে কি না— এমন প্রশ্নের উত্তরে মুখপাত্র স্মরণ করিয়ে দেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বিগত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরীয় আঞ্চলিক জোট 'বিমসটেক'-এর বর্তমান চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত থাকার কারণে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনেও উপস্থিত থাকার নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সংবাদের প্রাথমিক তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য Daily Bhorer Dak-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতামত ও কূটনৈতিক মূল্যায়ন (Expert Opinions)
১. ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি (Positive Viewpoint):
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিশ্বরাজনীতি বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, ভারতের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো নেতিবাচক জবাব না দিয়ে 'আইনি ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার' কথা বলা কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বার্তা। এটি নির্দেশ করে যে, ভারত সরকার বাংলাদেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ও সুনির্দিষ্ট বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছে। ভারতের আইনগত পর্যালোচনার এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার সুসম্পর্ক বজায় রেখে আইনি সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।
২. নেতিবাচক বা সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি (Critical Viewpoint):
অন্যদিকে, অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন যে 'প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা' করার কথা বলা আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি বহুল ব্যবহৃত দীর্ঘসূত্রতার কৌশলও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের স্পর্শকাতর রাজনৈতিক আসামিদের প্রত্যর্পণ ঝুলিয়ে রাখতে বছরের পর বছর ধরে জটিল আইনি প্রক্রিয়ার দোহাই দেওয়া হয়ে থাকে। ফলে বাংলাদেশ সরকার বাস্তবপক্ষে কত দ্রুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার কাজ সম্পন্ন করতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথেষ্ট সংশয় থেকে যায়।
